TT Ads

নিজস্ব প্রতিবেদক:

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়, ভিডিও কলের মাধ্যমে ঘনিষ্ঠতা, পরে সম্পর্কের অবনতি এবং সেই সূত্র ধরে একের পর এক মামলা, ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ। এমন নানা অভিযোগকে কেন্দ্র করে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে কর্মরত বাংলাদেশ রেলওয়ের এক নারী কর্মচারী সাবিনা ইয়াসমিনকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত বিভিন্ন নথি, আদালতে দায়ের করা একাধিক মামলার কপি, ভিডিও ও স্থিরচিত্র, ভুক্তভোগী দাবি করা কয়েকজন ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাবিনা ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে বিশেষ করে সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলার পর নানা ধরনের জটিলতায় ফেলার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সবগুলোই এখনো আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলো বিচারাধীন বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

অভিযুক্ত সাবিনা ইয়াসমিনের বাড়ি বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জ উপজেলার কুমারিয়া জোলা এলাকার মহিষচরণী গ্রামে। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের একজন লেভেল ক্রসিং গেটকিপার হিসেবে দেওয়ানগঞ্জ এলাকায় কর্মরত বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে অভিযোগ

অনুসন্ধানে অংশ নেওয়া একাধিক ব্যক্তি দাবি করেন, অভিযুক্ত নারী বিভিন্ন নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়। বিশেষ করে ফেসবুক ও টিকটকের মাধ্যমে নতুন ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচিত হন। এরপর দীর্ঘ সময় চ্যাটিং, ভিডিও কল এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। পরবর্তীতে সেই সম্পর্ককে কেন্দ্র করে আর্থিক ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী দাবি করা ব্যক্তিরা।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে ভিডিও কল বা ব্যক্তিগত কথোপকথনের অংশ সংরক্ষণ করে তা ভবিষ্যতে চাপ সৃষ্টির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সেনাসদস্যদের লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ

অনুসন্ধানে সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে সেনাবাহিনীর সদস্যদের নাম। একাধিক সূত্রের দাবি, অভিযুক্ত নারী সাধারণ ব্যক্তিদের তুলনায় সেনাসদস্যদের প্রতিই বেশি আগ্রহ দেখাতেন। পরিচয়ের পর ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তুলে পরবর্তীতে বিরোধ সৃষ্টি হলে মামলা বা অভিযোগের পথ বেছে নেওয়া হতো।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য বলেন,

“আমাদের জানা মতে, একাধিক সেনাসদস্য একই ধরনের ঘটনার শিকার হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং পরে মামলা, ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ, সব ক্ষেত্রেই একটি মিল পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সংস্থার গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা উচিত।”

সাদেকের পরিবারের অভিযোগ

মামলার নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগরের এক সেনাসদস্য সাদেক (ছদ্মনাম) এবং তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

সাদেকের পরিবারের দাবি, ফেসবুকে পরিচয়ের পর দীর্ঘদিন যোগাযোগ ছিল। পরে সম্পর্কের অবনতি হলে বিভিন্ন সময় অর্থ দাবি করা হয়। দাবিকৃত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানানো হলে আদালতে মামলা এবং বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছেও অভিযোগ পাঠানো হয়।

তবে মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন থাকায় অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি।

আরেক সেনাসদস্যের পরিবারও একই অভিযোগ তুলেছে

ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার এক সেনাসদস্য এবং তার অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য পিতার বিরুদ্ধেও একই ধরনের মামলা রয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।

পরিবারটির দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি হলেও পরবর্তীতে তা ভেঙে গেলে পুরো পরিবারকে আসামি করে মামলা করা হয়।

পরিবারের এক সদস্য বলেন,

“আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আদালতেই সত্য বেরিয়ে আসবে। তবে একই ধরনের অভিযোগে একাধিক পরিবারের নাম জড়িয়ে যাওয়ায় বিষয়টি তদন্ত হওয়া দরকার।”

আরও অভিযোগ

অনুসন্ধান চলাকালে ময়মনসিংহ অঞ্চলের আরেক সাবেক সেনাসদস্যের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারাও একই ধরনের অভিযোগ করেন। যদিও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকারি কোনো তদন্ত প্রতিবেদন প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।

ভুক্তভোগী দাবি করা একাধিক ব্যক্তি বলেন, অভিযুক্ত নারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে একই কৌশলে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন বলে তাদের ধারণা।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছেও লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো বিভাগীয় তদন্ত বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

এ নিয়ে রেলওয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,

“লিখিত অভিযোগ পেলে অবশ্যই নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত হওয়ার সুযোগ থাকে। নির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণের ভিত্তিতেই বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।”

অভিযুক্তের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার সাবিনা ইয়াসমিনের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। ফোনে যোগাযোগ সম্ভব না হওয়ায় খুদে বার্তাও পাঠানো হয়। পরে সংক্ষিপ্তভাবে যোগাযোগ হলেও তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বিশেষজ্ঞদের মত

আইনজীবীদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক সম্পর্ক, ব্ল্যাকমেইল, অর্থ আদায় কিংবা মিথ্যা মামলা, সবই গুরুতর অভিযোগ। তবে যেহেতু এসব বিষয়ে আদালতে বিচার প্রক্রিয়া চলমান, তাই কোনো পক্ষকে আদালতের রায়ের আগে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে আখ্যায়িত করা সমীচীন নয়।

তাদের মতে, একই ধরনের অভিযোগ যদি একাধিক ব্যক্তি করে থাকেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও তদন্তকারী সংস্থার উচিত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা।

(চলবে…)

TT Ads

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *