TT Ads

বরিশাল প্রতিনিধি:
বরিশালের হিজলা উপজেলা ভূমি অফিসে কর্মরত নাজির ওদুদ মুন্সির বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির অভিযোগ আরও বিস্তৃত আকারে সামনে আসছে। প্রথম পর্বে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পর একাধিক ভুক্তভোগী ও স্থানীয় ব্যক্তি নতুন করে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেছেন। তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্রের মাধ্যমে ভূমি অফিসে সাধারণ মানুষের ভোগান্তিকে পুঁজি করে অবৈধ অর্থ আদায়ের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের দাবি, নামজারি, খতিয়ান সংশোধন, জমির শ্রেণি পরিবর্তন, খাজনা পরিশোধ, পর্চা উত্তোলন, রেকর্ড যাচাই, দাখিলা সংগ্রহসহ বিভিন্ন সেবা নিতে গেলে দালালচক্রের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত সরকারি ফি জমা দিলেও অনেক ক্ষেত্রে কাজ দীর্ঘদিন আটকে রাখা হয়। পরে বিভিন্ন অজুহাতে অতিরিক্ত অর্থ দিলে দ্রুত কাজ সম্পন্ন হয় বলে অভিযোগ করেন কয়েকজন সেবাগ্রহীতা।

একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, সরকারি অফিসে সেবা নিতে গিয়ে তারা নিজেদের অসহায় মনে করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করলেও ছোটখাটো ত্রুটি দেখিয়ে আবেদন ঝুলিয়ে রাখা হয়। পরে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে যোগাযোগ করলে দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়। এতে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভূমি অফিসকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে। ওই চক্রের সদস্যরা অফিসের বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে আগাম তথ্য জেনে সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কাজ দ্রুত করে দেওয়ার আশ্বাস দেন। অভিযোগ রয়েছে, এই দালালদের সঙ্গে অফিসের কিছু অসাধু ব্যক্তির যোগসাজশ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ এই প্রতিবেদনের হাতে আসেনি।

স্থানীয় কয়েকজন প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, ভূমি সংক্রান্ত কাজ এমনিতেই জটিল। তার ওপর যদি কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। তারা বলেন, দুর্নীতির কারণে অনেক মানুষ মাসের পর মাস অফিসে ঘুরেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পান না।

এদিকে ওদুদ মুন্সির বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও নতুন করে সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, তিনি দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থেকে বিভিন্ন মহলের সঙ্গে প্রভাবশালী সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। সেই প্রভাব ব্যবহার করে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়েছে বলে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে আনুষ্ঠানিক কোনো সরকারি নথি বা আদালতের রায় পাওয়া যায়নি।

ভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ, কেউ অনিয়মের প্রতিবাদ করলে বা ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার কাজ আরও বিলম্বিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাওয়া কিংবা নতুন নতুন জটিলতা তৈরি করা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সেবাগ্রহীতা। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

এছাড়া স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা রয়েছে, সরকারি চাকরির আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদের মালিক হয়েছেন ওদুদ মুন্সি। অভিযোগ রয়েছে, রাজধানী ঢাকা ও বরিশালে বাড়ি ও ফ্ল্যাটসহ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পদ রয়েছে তার। তবে এসব সম্পদের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন বা দুদকের আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

কিছু স্থানীয় ব্যক্তি দাবি করেন, তার ব্যক্তিগত আচরণ এবং প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করেও এলাকায় নানা বিতর্ক রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বপক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই বিষয়গুলো তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা।

স্থানীয় আইনজীবী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকদের মতে, ভূমি অফিস এমন একটি দপ্তর যেখানে প্রতিদিন শত শত মানুষ সেবা নিতে আসেন। সেখানে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষ, অনিয়ম কিংবা হয়রানির অভিযোগ উঠলে তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। তারা বলেন, অভিযোগ মিথ্যা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সম্মান রক্ষা হবে, আর সত্য হলে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

তাদের মতে, ভূমি প্রশাসনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল সেবার পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি দালালচক্র নির্মূল, অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা এবং নিয়মিত নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে এবং সরকারি সেবার প্রতি আস্থা বৃদ্ধি পাবে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত নাজির ওদুদ মুন্সির সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ভবিষ্যতে তিনি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো বক্তব্য দিলে তা গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।

এদিকে ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের দাবি, হিজলা উপজেলা ভূমি অফিসে ওঠা সব অভিযোগের বিষয়ে জেলা প্রশাসন, ভূমি মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত পরিচালনা করা হোক। তাদের বিশ্বাস, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হলে একদিকে যেমন নির্দোষ ব্যক্তির সম্মান অক্ষুণ্ন থাকবে, অন্যদিকে অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পথ সুগম হবে।

TT Ads

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *