নিজস্ব প্রতিবেদক:: বরিশাল নগরীর দক্ষিণ আলেকন্দা এআরএস মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী তামান্না আফরিনকে (১৫) আত্মহত্যায় বাধ্য করেছে তার কথিত প্রেমিক সাদমান গালিব। অভিযোগ পাওয়া গেছে, চাইনিজ খাবারের সাথে চেতনাশক ওষুধ মিশিয়ে তা খাওয়ানোর পর অচেতন করে অশ্লিল ছবি তুলে সটকে পড়েন সাদমান।
বিষয়টি বুঝতে পরে তামান্না রাগে ক্ষোভে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এ ঘটনায় গত মঙ্গলবার রাতে তামান্নার বাবা রফিকুল ইসলাম টিপুকে একমাত্র সাদমানকে আসামি করে কোতোয়ালী মডেল থানায় অভিযোগ দিলেও তা আজ পর্যন্ত মামলা হিসেবে রুজু করেনি পুলিশ।
সাদমান নগরীর জুমির খান সড়কের বাসিন্দা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এলাকাবাসী তাকে বখাটে হিসেবেই চেনেন।
টিপু জানান, প্রায় ৬ মাস আগে তামান্নাকে চাইনিজ খাবারের আড়ালে চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে নিজ বাসায় নিয়ে যায় গালিব। খবর পেয়ে গালিবের বাসা থেকে প্রায় সংজ্ঞাহীন অবস্থায় তামান্নাকে উদ্ধার করি।
ওইদিন তামান্নার অশালীন ছবি এবং ভিডিও মোবাইল ফেনো ধারণ করে রাখে গালিব। পরে ওই ছবি এবং ভিডিও সামাজিক যোগযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল করে দেয়ার ভয় দেখিয়ে তামান্নার কাছে ৫ হাজার টাকা দাবি করে গালিব। এমনকি ছবি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে তামান্নার সাথে বিভিন্ন সময় শারীরিক সম্পর্কে জড়ায় বলে সন্দেহ বাবার।
ওই অশ্লীল ছবি নিজ হেফাজতে রেখে গালিব তার কথিত প্রেমিকা তামান্নার কাছ থেকে সটকে পড়ে। গত কিছুদিন ধরে তামান্নার সাথে একেবারে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে তামান্না। প্রেমিকের প্রতারণার কারণে রাগে-ক্ষোভে এবং অভিমানে গত ২ এপ্রিল দুপুরে নানাবাড়িতে ফ্যানের সাথে ওড়না বেঁধে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে তামান্না।
মৃত্যুর পর তামান্নার পড়ার টেবিলে অংক খাতার শেষ পৃষ্ঠায় তামান্নার হাতের লেখা একটি চিরকুট (সুইসাইড নোট) পায় তার পরিবার।
চিরকুটে লেখা রয়েছে, ‘আমি আজ সবাইকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি। আমার মৃত্যুর জন্য শুধু একজনই দায়ী। তার নাম হলো সাদমান গালিব। আমি ওকে অনেক ভালোবাসি। কিন্তু ও (গালিব) আমার সাথে আর সম্পর্ক রাখতে চায় না। তাই আমি ওকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না ভেবে সবাইকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি। আমি সাদমানকে অনেক ভালোবাসি, ও বুঝল না। আশা করি আমার মরার পর ও (গালিব) আমার ভালোবাসাটা অনুভব করবে। আমি আর বেশী কিছু বলতে চাই না। বিদায় সাদমান।’
ওই চিরকুটসহ গত মঙ্গলবার সাদমান গালিবের বিরুদ্ধে কোতোয়ালী থানায় একটি অভিযোগ দিয়েছেন তামান্নার বাবা রফিকুল ইসলাম টিপু।
তিনি অভিযোগ করেন, কথিত প্রেমিকের প্ররোচণায় ২ এপ্রিল তার মেয়ে তামান্না আত্মহত্যা করলো। ৪ দিন পর ৬ এপ্রিল তিনি প্রমাণসহ কোতোয়ালী মডেল থানায় অভিযোগ দিয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পুলিশ অভিযুক্ত সাদমানকে গ্রেপ্তার কিংবা তার অভিযোগ মামলা হিসেবে রুজু করেনি।
ওইদিন তামান্নার মরদেহ উদ্ধারকারী কোতোয়ালী মডেল থানার উপ-পরিদর্শক অলিভ জানান, তামান্নার ব্যবহৃত মুঠোফোন জব্দ করা হয়েছে। মুঠোফোনে কিছু আলামত পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন কোতোয়ালী মডেল থানার ওসি নুরুল ইসলাম।
মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার শাহাবুদ্দিন খান বলেন, পুলিশ এ বিষয়ে কোনো তাচ্ছিল্য করছে না। কোনো শৈথিল্যও দেখাচ্ছে না। ওই মেয়েটির মোবাইল ফোনে পাওয়া বিভিন্ন ছবি এবং তার লেখা চিরকুট যাচাই করা হচ্ছে। এ ঘটনায় ওই ছাত্রীর বাবার দেয়া অভিযোগ মামলা হিসেবে রুজু করে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
প্রসঙ্গত, তামান্না আফরিনের বাবা ও মায়ের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ হয় ২০১৮ সালে। এরপর থেকে তামান্না ও তার ছোট বোন তাহিয়া থাকতো নগরীর কাজীপাড়া এলাকার নানা হাফেজ মো. আলমগীরের বাসায়। কাজের সুবাদে বাবা থাকতেন অন্যত্র। মা জাকিয়া বেগম চাকরি করায় মেয়েদের তেমন দেখভাল করতে পারতেন না। বাবা-মায়ের শিথিলতার সুযোগে তামান্নার সাথে ফেসবুকে পার্শবর্তী জুমির খান সড়কের সাদমান গালিবের পরিচয় এবং এক পর্যায়ে প্রেমের সম্পর্ক হয়।