মামুনুর রশিদ নোমানী //
গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলায় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ঘিরে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) এইচ এম আনসার। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ঠিকাদার ও বাসিন্দাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পের নামে অর্থ লেনদেন, ঘুষ এবং কাজ না করেই বিল উত্তোলনের মতো অনিয়ম চলে আসছে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরির আড়ালে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন এই কর্মকর্তা। বরিশাল ও ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, বিভিন্ন স্থানে জমি, প্রায় দুই শত ভরি স্বর্ণ এবং ব্যক্তিগত গাড়িসহ বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন তিনি। বরিশাল নগরীর সদর রোডের একটি বহুতল ভবনেও রয়েছে তার ফ্ল্যাট। এছাড়া আত্মীয়স্বজনের নামেও সম্পদ থাকার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
“ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না”
স্থানীয় ইউপি সদস্য ও চেয়ারম্যানদের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট হারে অর্থ কেটে রাখা হয়। প্রকল্পভেদে ১৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত টাকা “অফিস খরচ” বা অনানুষ্ঠানিকভাবে দিতে হয়।
একজন ইউপি সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“প্রকল্প শেষ করেও পুরো টাকা পাওয়া যায় না। বিল নিতে গেলেই নানা অজুহাতে টাকা কেটে রাখা হয়।”
আরেক জনপ্রতিনিধির ভাষ্য,
“কাজ ঠিকমতো করলেও নির্দিষ্ট অংশ না দিলে বিল আটকে রাখা হয়।”
টিআর ও কাবিখা প্রকল্পে গরমিল
গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ টিআর ও কাবিখা প্রকল্প নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, অনেক প্রকল্প কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে তার অস্তিত্ব নেই।
স্থানীয়দের ভাষায়,
“কাগজে কাজ হয়, মাঠে গেলে কিছুই পাওয়া যায় না।”
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের সভাপতি ও দপ্তরের কিছু কর্মকর্তার মধ্যে যোগসাজশে কাজ না করেই বিল উত্তোলন করা হচ্ছে এবং সেই অর্থ ভাগবাটোয়ারা করা হচ্ছে।
“আগে টাকা, পরে কাজ”
একাধিক ঠিকাদারের অভিযোগ, প্রকল্প শুরু বা ফাইল অগ্রসর করতে আগেই অর্থ দিতে হয়।
একজন ঠিকাদার বলেন,
“কিছু না দিলে ফাইল নড়ে না—এটাই এখন নিয়ম হয়ে গেছে।”
এমনকি প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও বিল পেতে আবারও অর্থ দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
বরাদ্দের সিংহভাগ তছরুপের অভিযোগ
মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দির, কবরস্থান, রাস্তাঘাট, ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের বড় অংশই অনিয়মের মাধ্যমে তছরুপ হচ্ছে বলে দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পের কাজ না করেই ভুয়া বিল দেখিয়ে টাকা উত্তোলন করা হচ্ছে।
সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি বেতনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এই বিপুল সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের অভিযোগ যাচাইয়ে আয়কর নথি, সম্পত্তির দলিল এবং ব্যাংক হিসাব খতিয়ে দেখা জরুরি।
প্রশাসনের নীরবতা
এত অভিযোগের পরও দৃশ্যমান কোনো তদন্ত না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
একজন বাসিন্দা বলেন,
“অভিযোগ বহুদিনের, কিন্তু ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো লক্ষণ নেই।”
স্বচ্ছতা নিশ্চিতের দাবি
সুশাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উপজেলা পর্যায়ের প্রকল্পে স্বচ্ছতা আনতে ডিজিটাল মনিটরিং, সামাজিক নিরীক্ষা এবং নিয়মিত অডিট বাধ্যতামূলক করা জরুরি। তা না হলে উন্নয়ন প্রকল্পের ওপর জনসাধারণের আস্থা নষ্ট হবে।
বক্তব্য মেলেনি
অভিযোগের বিষয়ে জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও পিআইও এইচ এম আনসারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যাতে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হয়।
সূত্র ইত্তেহাদ নিউজ





