মামুনুর রশীদ নোমানী :
বরিশাল সিটি করপোরেশনে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনকে কেন্দ্র করে নতুন করে দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থাপনের চেয়ে অতিরিক্ত সংখ্যা দেখিয়ে এবং প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি বিল করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও আইটি কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) আহসান উদ্দিন রোমেলের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি দায়িত্ব পালন করার আড়ালে তিনি ঠিকাদারি কাজেও জড়িত এবং বিভিন্ন প্রকল্পে নিজের প্রভাব খাটিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন।
সিটি করপোরেশনের ভেতরের একাধিক সূত্র জানায়, রোমেলের নানা কর্মকাণ্ডের কারণে অনলাইন ট্রেড লাইসেন্স কার্যক্রমও ভেস্তে যায়। প্রযুক্তিনির্ভর এই সেবা চালুর সব প্রস্তুতি শেষ হলেও উদ্বোধনের ঠিক আগমুহূর্তে পুরো কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি হয়। এতে সিটি করপোরেশনের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হয়।
অভিযোগ রয়েছে, সাবেক মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহর সময়ে দুর্নীতি ও বিভিন্ন অনিয়মের কারণে একবার চাকরি হারানো এই কর্মকর্তা পরবর্তীতে আবার প্রভাব খাটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ফিরে আসেন। এরপর থেকেই আইটি খাতসহ বিভিন্ন প্রকল্পে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নিজের প্রতিষ্ঠান পিপলো বিডির মাধ্যমে সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন আইটি প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার করেন রোমেল। গোপনে নিজের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ পাইয়ে দিয়ে আইটি বিভাগসহ বিভিন্ন দপ্তরের সুযোগ-সুবিধা নেন। এক পর্যায়ে পিপলো বিডির করা প্রকল্পের বিল আটকে দেয় সিটি করপোরেশনের সচিব মাসুমা আক্তার। পরে ভাগাভাগির মাধ্যমে সেই অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে। কমিশনের সম্পর্কের জেরে রোমেল জনসংযোগ কর্মকর্তার পাশাপাশি আইটি বিভাগের দায়িত্বও নিজের হাতে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আইটি বিভাগের দায়িত্ব নেওয়ার পর নানা প্রকল্পে অতিরিক্ত বিল, ভুয়া ভাউচার এবং কাগুজে খরচ দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ সামনে আসে। মেয়রের ঈদ শুভেচ্ছা ব্যানার, সাইনবোর্ড ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত প্রচারণার নামে বিপুল অঙ্কের বিল তোলা হয় বলে জানা গেছে।
নেটওয়ার্ক স্থাপনের জন্য দুই লাখ টাকা বিল দেখিয়ে মাত্র ৭৬ হাজার টাকার কাজ সম্পন্ন করে বাকি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া সাবেক মেয়র খোকন সেরনিয়াবাতের ঈদ শুভেচ্ছা ব্যানার, সাইনবোর্ড ও ফেস্টুন বাবদ ১৩ লাখ টাকা উত্তোলন করা হলেও বাস্তবে প্রায় ৭ লাখ টাকার ব্যানার ও ফেস্টুন লাগিয়ে বাকি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নামমাত্র বুস্টিং করে এক লাখ ৫৮ হাজার ২৩৭ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এদিকে রোমেলের নানা অপকর্মের তথ্য জানতে সম্প্রতি তরিকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেছেন। সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন প্রকল্প, বিল ও আইটি খাতের ব্যয়ের হিসাব চেয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন জমা দেন।
অন্যদিকে সম্প্রতি সিটি করপোরেশনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনেও রোমেলের বিষয়টি সামনে আসে। আন্দোলনকারীদের অন্যতম দাবিই ছিল দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে আহসান উদ্দিন রোমেলকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা।
সব মিলিয়ে বরিশাল সিটি করপোরেশনের ভেতরে জনসংযোগ কর্মকর্তা রোমেলকে ঘিরে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে নতুন করে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি দায়িত্বে থেকে ঠিকাদারি, বিল জালিয়াতি ও প্রকল্প বাণিজ্যের অভিযোগের বিরুদ্ধে প্রশাসন কী ব্যবস্থা নেয়।









