নিজস্ব প্রতিবেদক //ঝালকাঠির মতো একটি ছোট জেলা শহরে দায়িত্বের পোশাককে ঢাল বানিয়ে যে বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্য চলেছে, তার মূল কারিগর ছিলেন ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট হাসান। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর দায়িত্বে থেকেও তিনি সাধারণ মানুষ ও পরিবহন খাতকে জিম্মি করে গড়ে তুলেছিলেন একটি সংগঠিত মাসোয়ারা ব্যবস্থা। অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে ট্রাফিক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে পুলিশ লাইনে ন্যস্ত করা হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তে ঝালকাঠিবাসীর প্রশ্ন থামেনি, বরং আরও গভীর হয়েছে।
বাংলাদেশ পুলিশে সার্জেন্ট পদটি নন-গেজেটেড এবং জাতীয় বেতন কাঠামো অনুযায়ী গ্রেড–৯ ভুক্ত। এই গ্রেডে একজন সার্জেন্টের মূল বেতন প্রায় ২২ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়। ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ যোগ হলেও মোট মাসিক আয় সীমিত পর্যায়ের মধ্যেই থাকে। এই আয়ে পরিবার নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব হলেও বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস, উচ্চ ব্যয়ের জীবনধারা ও বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া স্বাভাবিক নয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সার্জেন্ট হাসান ঝালকাঠি শহরের প্রাণকেন্দ্র ফায়ার সার্ভিস মোড়ের একটি বিলাসবহুল ভবনে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন।ওই ফ্ল্যাটের মাসিক ভাড়া ছিল ১৬ হাজার ৫০০ টাকা। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে তার বসবাস ছিল আড়ম্বরপূর্ণ। স্থানীয়দের ভাষায়, তার পরিবারের জীবনযাপন ছিল প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের মতো।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, খুবই অস্বচ্ছল পরিবার থেকে উঠে আসা এই হাসান কীভাবে অল্প সময়ের মধ্যে এত সম্পদের মালিক হলেন। অভিযোগ রয়েছে, নিজের নামের পাশাপাশি স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নাম ব্যবহার করে বেনামে গড়ে তুলেছেন জমি, ফ্ল্যাট ও নগদ অর্থসহ নানা সম্পদ। এসব সম্পদের বৈধ উৎস আজও স্পষ্ট নয়।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ট্রাফিক বিভাগের দায়িত্বকে ব্যবহার করে তিনি নিয়মিত মাসোয়ারা আদায় করতেন। মাইক্রোবাস স্ট্যান্ড, বাস টার্মিনাল ও রিকুইজিশন স্লিপ বিক্রি ছিল তার ব্যক্তিগত আয়ের বড় উৎস। দূরপাল্লার বাস, টমটম, কাভার ভ্যান ও ট্রাক থেকে মামলা দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় ছিল নিয়মিত ঘটনা।
শহরের প্রবেশপথে গাড়ি থামিয়ে কাগজপত্র যাচাইয়ের নামে হয়রানি, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের দিকে চোখ বন্ধ রাখা এবং সাধারণ চালকদের ওপর বাড়তি চাপ ছিল তার কার্যক্রমের অংশ। এসব অনিয়মের ফলেই গড়ে উঠেছে তার বিলাসী জীবন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
এই প্রসঙ্গে ঝালকাঠি পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, ট্রাফিক বিভাগে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সার্জেন্টকে তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি প্রশাসনিক অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।
তবে ঝালকাঠিবাসীর দাবি এখানেই শেষ নয়। তারা মনে করেন, শুধু দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নেওয়া যথেষ্ট নয়। সার্জেন্ট হাসানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান চালাতে হবে। অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের উৎস বের করে রাষ্ট্রের কোষাগারে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ঝালকাঠির সচেতন মহলের মতে, গ্রেড–৯ এর একজন সার্জেন্ট যদি এভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত সম্পদ গড়ার হাতিয়ারে পরিণত করতে পারেন, তাহলে তা পুরো ব্যবস্থার জন্যই একটি অশনিসংকেত। দৃষ্টান্তমূলক তদন্ত ও শাস্তি নিশ্চিত না হলে এই ঘুষের চক্র থামবে না বলেই তাদের মত।







