নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল
বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা (নাজির) মো. আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে সরকারি উন্নয়ন তহবিলের টাকা পরিকল্পিতভাবে লুটপাটের ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে। একের পর এক ভুয়া ও কাগুজে প্রকল্প দেখিয়ে তিনি বছরের পর বছর সরকারি অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। বাস্তবে কাজ না করেই ভুয়া ভাউচার তৈরি করে বিপুল অঙ্কের টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও স্থানীয় সূত্রের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ টিআর কর্মসূচির আওতায় নিজের গ্রামের মসজিদের নামে ধারাবাহিকভাবে বরাদ্দ এনে টাকা তুলেছেন আনোয়ার হোসেন। উত্তর ভিটাবাড়িয়া ডাকুয়াবাড়ি জামে মসজিদের নামে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৫০ হাজার টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১ লাখ টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ লাখ টাকা, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, কাগজে বরাদ্দ দেখানো হলেও মসজিদে সে অনুপাতে কোনো উন্নয়ন চোখে পড়েনি।
এখানেই শেষ নয়। বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় ও বাসভবনকেন্দ্রিক একাধিক প্রকল্পের নামেও বিপুল অঙ্কের টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এর মধ্যে রয়েছে,
- বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বাগান “দৃষ্টিনন্দন ও ব্যবহার উপযোগী” করার নামে ২০২১-২২ অর্থবছরে ২ লাখ টাকা।
- বাংলোর অভ্যন্তরের মসজিদ মেরামতে ৫০ হাজার টাকা।
- বাংলোর পশ্চিম পাশের পুকুর পাড় ও ঘাটলা মেরামতে ২ লাখ টাকা।
- বাসভবনের গাড়ির গ্যারেজ মেরামতে ১ লাখ টাকা।
- বিভাগীয় কমিশনারের একান্ত সচিবের জর্ডন রোডের সরকারি বাসভবন সংস্কারের নামে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
- বিভাগীয় সদর দপ্তরের মসজিদ সংস্কারের নামে ২ লাখ টাকা।
- বাসভবনের অভ্যন্তরে মাল্টিপারপাস সেড সংস্কারের নামে ২ লাখ টাকা।
- দোলনার চারপাশে সেড নির্মাণ ও ডেকোরেটিভ গাছ রোপণের নামে ২ লাখ টাকা।
এরপরও থেমে থাকেননি তিনি। ২০২২-২৩ অর্থবছরের দ্বিতীয় কিস্তিতে একান্ত সচিবের বাসভবন মেরামতের নামে আরও ২ লাখ টাকা এবং তৃতীয় কিস্তিতে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। একই বছরে “পুকুর দৃশ্যমান করার” অজুহাতে গাড়ির গ্যারেজ ভেঙে পুকুরঘাট পর্যন্ত পথ তৈরির নামে ৩ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে, যদিও বাস্তবে সে ধরনের কোনো বড় কাজ চোখে পড়েনি বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে আবারও একই বাসভবন মেরামতের নামে ২ লাখ টাকা, সদর দপ্তর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার নামে ২ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের ড্রাইভার সেড সংস্কারের নামে ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা এবং অফিস চত্বর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার নামে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ এনে তুলে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এসব প্রকল্পের বেশিরভাগই ছিল কাগুজে। বাস্তবে কাজ না করেই ভুয়া ভাউচার তৈরি করে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এতে সরকারি কোষাগারের বড় অঙ্কের অর্থ অপচয় হয়েছে, অথচ দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা ও কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মচারীর মতে, আনোয়ার হোসেন টানা ১৪ বছর একই কর্মস্থলে থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে শক্ত একটি বলয় তৈরি করেছেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি নিজের ও আত্মীয়-স্বজনের নামে একাধিক প্রকল্প দেখিয়ে সরকারি উন্নয়ন তহবিল থেকে অর্থ সরিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, “উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশেই সবকিছু করা হয়েছে।” তবে তিনি নির্দিষ্ট করে কার নির্দেশে এসব প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট করেননি।
এ বিষয়ে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হবে এবং প্রমাণ মিললে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।







