বরিশাল নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত ও সড়ক দখল করে গড়ে ওঠা অস্থায়ী দোকানগুলোতে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের বাণিজ্য চলছে। এসব অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে প্রভাবশালী একটি মহল বছরে কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। স্থানীয়দের অভিযোগ, এর সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতাদের সরাসরি সম্পর্ক থাকায় বিদ্যুৎ বিভাগ তেমন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীর বেলস পার্ক, বধ্যভূমি এলাকার কীর্তনখোলা নদীর তীর, সিঅ্যান্ডবি রোডের চৌমাথার লেকপাড়, নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল, রূপাতলীর চৌমাথা, ফজলুল হক অ্যাভিনিউ এবং নগর ভবনের সামনের ফুটপাত ও সড়কে প্রায় এক হাজার অস্থায়ী দোকান রয়েছে। এসব দোকানে চার হাজারের বেশি অবৈধ বৈদ্যুতিক বাতি ব্যবহার হচ্ছে।
দোকানিরা জানিয়েছেন, প্রতিটি দোকানে দুই থেকে তিনটি সকেট ব্যবহার করা হচ্ছে। হিসাব অনুযায়ী দুই হাজার সকেটের মাধ্যমে কমপক্ষে ২০ হাজার বাতি জ্বালানো হচ্ছে। প্রতি সকেট থেকে ২০ টাকা হারে দৈনিক ৪০ হাজার টাকা, মাসে ১২ লাখ এবং বছরে ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকার আয় হচ্ছে।
ওজোপাডিকোর বরিশাল বিদ্যুৎ বিতরণ কেন্দ্র-১-এর কর্মকর্তারা জানান, এসব এলাকায় ২০ হাজার বাতি ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্র ব্যবহারে কমপক্ষে প্রতিদিন ৪০ হাজার কিলোওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হওয়ার কথা। প্রতি এক হাজার কিলোওয়াটের জন্য এক ইউনিট বিদ্যুৎ বিল আসে। সেই হিসাবে চার হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হলে বাণিজ্যিক মিটারের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১৫ দশমিক ৬২ টাকা হারে দৈনিক প্রায় ৬২ হাজার ৪৮০ টাকা। মাসে বিল দাঁড়ায় ১৯ লাখ ৬৮ হাজার ১২০ টাকা এবং বছরে ২ কোটি ৩৯ লাখ ৪৫ হাজার ৪৬০ টাকা।
নগরের ফুটপাত ও অস্থায়ী দোকানগুলোর অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের কোনো হিসাব বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে নেই। ফলে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, এসব দোকান এবং বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ন্ত্রণ করছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। তাই রাজনৈতিক ঝামেলা এড়াতে বিদ্যুৎ বিভাগ তেমন উদ্যোগী হচ্ছে না।
দোকানিরা বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সড়কঘেঁষা এলাকায় অস্থায়ী দোকানের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। আগে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা বিদ্যুৎ বিল নিতেন, বর্তমানে তা নিচ্ছেন বিএনপির স্থানীয় নেতারা। নামমাত্র কয়েকটি বাণিজ্যিক মিটার থাকলেও অধিকাংশই অচল। বিদ্যুৎ সরবরাহ নেওয়া হচ্ছে সিটি করপোরেশনের সড়কবাতি বা বিদ্যুৎ বিভাগের মূল লাইন থেকে অবৈধভাবে।
সরেজমিনে বিবির পুকুরপাড় এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সোহেল চত্বরের পাশের একটি বৈদ্যুতিক খুঁটিতে চারটি মিটার রয়েছে। তবে এর মধ্যে দুটি অচল। আশপাশের দোকানিরা জানান, মিটার ব্যবহার না করেই পাশের একটি ভবন থেকে সড়কবাতির লাইনের মাধ্যমে সংযোগ দেওয়া হচ্ছে।
বেলস পার্ক এলাকার দোকানিরা জানান, কীভাবে সংযোগ দেওয়া হয় তা তারা জানেন না। তবে এলাকার প্রায় দুই শতাধিক দোকান থেকে প্রতিটি সকেটের জন্য ২০ টাকা করে নেওয়া হয়।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব), বরিশাল জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রনজিৎ দত্ত বলেছেন, ‘দোকানিরা বিদ্যুৎ বিলের নামে টাকা আদায় করে নিজের পকেট ভরছেন। এতে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অসাধু ব্যক্তিরা বিতরণ সংস্থার কিছু অসাধু সদস্যের সহায়তায় মিটার ট্যাম্পারিং করে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। ফলে একদিকে বিদ্যুৎ চুরি হচ্ছে, অন্যদিকে সিস্টেম লসের বোঝা নিয়মিত গ্রাহকের ওপর চাপানো হচ্ছে।’
রনজিৎ দত্ত বলেন, ‘যদি দোকানগুলো বৈধ সংযোগের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়, তবে বিদ্যুৎ বিভাগ বছরে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করতে পারবে।’
ওজোপাডিকোর বরিশাল বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্র-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুল কুমার স্বর্ণকার বলেন, ‘সাইড লাইন দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্পূর্ণ অবৈধ। একটি মিটার থেকে একাধিক সংযোগও আইনবিরুদ্ধ। আমরা সিটি করপোরেশনের সঙ্গে আলোচনা করে অভিযান শুরু করব। এ ক্ষেত্রে সব মহলের সহযোগিতা প্রয়োজন।’







