TT Ads

 

নিজস্ব প্রতিবেদক //
বরিশালে বদলি ঠেকানোর উদ্দেশ্যে সরকারি স্কুলের তিন শিক্ষক যে নাটক সাজিয়েছেন, তা প্রশাসনিক দুর্নীতির এক ভয়ংকর দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। কাগজে-কলমে গ্রেফতার, আদালতে হাজিরা ও জামিনের পুরো প্রক্রিয়া দেখানো হলেও বাস্তবে এই তিন শিক্ষক থানার গারদে যাননি, এমনকি কোথাও তাদের আটক হওয়ার দৃশ্যও নেই। এই ঘটনায় পুলিশ প্রশাসনের একটি অংশ, দুই স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, বদলি কার্যকর হওয়ার আগেই পরিকল্পিতভাবে তিন শিক্ষক নিজেদের নামে ফৌজদারি মামলা দেখিয়ে গ্রেফতার নাটক সাজান। অভিযুক্তরা হলেন বরিশাল জিলা স্কুলের সিনিয়র শিক্ষক শাহাদাৎ হোসেন, রূপাতলি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক আকতারুজ্জামান এবং একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. এ রাজ্জাক। ১০ ডিসেম্বর শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রজ্ঞাপনে তাদের তিনজনকে ভিন্ন তিন জেলায় বদলি করা হয়।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, শাহাদাৎ হোসেনকে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার ওছখালী খান সাহেব ছৈয়াদিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে, আকতারুজ্জামানকে পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার সতেন্দ্র নাথ বন্দোপাধ্যায় সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে এবং মো. এ রাজ্জাককে ভোলা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়। বদলির কয়েকদিনের মধ্যেই এই নাটকীয় গ্রেফতারের ঘটনা ঘটে।
১৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যার দিকে নগরীর টাউন হল এলাকায় উচ্চৈঃস্বরে কথা বলার অভিযোগে তিন শিক্ষককে ৮১ ধারায় গ্রেফতার দেখানো হয়। পরদিন আদালত থেকে তাদের জামিন নেওয়ার কাগজপত্র তৈরি করা হয়। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, ওই দিন তারা কোতয়ালী মডেল থানার হাজতে ছিলেন না। একই দিনে থানায় আটক থাকা অন্য আসামিদের বক্তব্য এবং থানা রেকর্ড পর্যালোচনায় এই তিন শিক্ষকের উপস্থিতির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ঘটনাস্থল টাউন হল, কোতয়ালী থানা এবং আদালত চত্বরের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায়ও তাদের যাতায়াতের কোনো দৃশ্য ধরা পড়েনি। এতে স্পষ্ট হয়, পুরো বিষয়টি ছিল কাগুজে নাটক। বিপুল অর্থের বিনিময়ে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, গ্রেফতারের বিষয়ে দুই স্কুলের প্রধান শিক্ষক প্রকাশ্যে অজ্ঞতা দেখালেও ১৪ ডিসেম্বর দুপুরেই শিক্ষা অধিদপ্তরে বদলি স্থগিতের জন্য সুপারিশপত্র পাঠানো হয়। এতে প্রমাণ মেলে, গ্রেফতারের নাটক সম্পর্কে তারা আগে থেকেই অবগত ছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম এবং রূপাতলি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মর্জিনা বেগম এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
এই ঘটনায় বরিশাল মেট্রোপলিটন কোতয়ালী মডেল থানার কতিপয় পুলিশ সদস্যের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। মামলার এজাহারে স্বাক্ষর থাকা সত্ত্বেও থানার শীর্ষ পর্যায় থেকে ঘটনাটি অস্বীকার করা হয়েছে, যা প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অভাবকে আরও স্পষ্ট করে।
সরকারি শিক্ষক বদলির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ঠেকাতে যদি এভাবে ভুয়া গ্রেফতার দেখানো যায়, তাহলে পুরো ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিষয়টি নিরপেক্ষ ও গভীরভাবে তদন্ত না হলে এই ধরনের দুর্নীতির চক্র আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই ঘটনায় শিক্ষা প্রশাসন, পুলিশ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহলে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষক শাহাদাৎ হোসেন মোবাইল ফোনে প্রথমে গ্রেফতার হয়েছেন বলে দাবি করেন। পরে তাকে বলা হয়, সিসিটিভি ফুটেজে আপনাদের গ্রেফতারের কোনো তথ্য নেই কেন? এরপর তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

বাকি দুই শিক্ষককে একাধিকবার কল করলেও তারা রিসিভ করেননি। খুদে বার্তা পাঠালেও তারা জবাব দেননি। পরে প্রতিষ্ঠানে গিয়েও তাদের পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, এমন কোন ঘটনা আমার জানা নেই। তিনজন সরকারি স্কুলের শিক্ষক গ্রেফতার হলে তো পুলিশ ও মিডিয়ায় জানার কথা। বিষয়টির খোঁজ নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

TT Ads