নিজস্ব প্রতিবেদক //
বরিশাল নগরীজুড়ে বিস্তৃত অবৈধ জুয়ার সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে উঠে এসেছে এক নাম—‘জুয়া শহীদ’। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে শহীদই নিয়ন্ত্রণ করছেন নগরীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা জুয়ার বোর্ড, যেখানে প্রতিদিন কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রশাসনের নীরবতা এবং কথিত ‘ম্যানেজমেন্ট’-এর সুযোগে এই চক্র দিন দিন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নগরীর গির্জা মহল্লা, বাজার রোড, কাঠপট্টি, ভাটার খাল সংলগ্ন এলাকা, ঈদগাহ মাঠের পাশ, ঘোরাচাঁদ রোড, কাউনিয়া, ভাটিখানা, বেলতলা ও তালতলীতে নিয়মিত বসছে এসব জুয়ার আসর। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে এসব এলাকায় জমে ওঠে ‘ওয়ান-টেন’সহ বিভিন্ন ধরনের জুয়ার আসর। শুধু বরিশাল নগরী নয়, আশপাশের উপজেলা ও জেলার খেলোয়াড়রাও এখানে ভিড় জমাচ্ছে।
রফিক নামের এক ব্যবসায়ী বলছে, এই বিশাল নেটওয়ার্কের মূল নিয়ন্ত্রক শহীদ, যিনি ‘জুয়া শহীদ’ নামেই বেশি পরিচিত। তার ছত্রছায়ায় পরিচালিত হচ্ছে পুরো সিন্ডিকেট। শহীদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে স্বর্ণকার শাহীন, স্বর্ণকার রিয়াজ, পোর্ট রোডের ইলিয়াস চায়ের দোকানের শাহীন এবং কাউনিয়ার বিভিন্ন ব্যক্তি সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ সরাসরি বোর্ড পরিচালনা করে, আবার কেউ অর্থ লগ্নি ও সুদের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে।
বিশেষ করে মুক্তি টিউবওয়েল লিটন, শামীম এবং স্বর্ণকার রিয়াজের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে—তারা জুয়ার বোর্ডে তাৎক্ষণিকভাবে হেরে যাওয়া খেলোয়াড়দের চড়া সুদে টাকা ধার দেয়। এতে করে একবার জুয়ার ফাঁদে পা দিলেই খেলোয়াড়রা ঋণের জালে আটকে পড়ে এবং ধীরে ধীরে সর্বস্বান্ত হয়ে যায়।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, শহীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেটের রয়েছে একটি সুসংগঠিত কাঠামো। প্রতিটি বোর্ডে থাকে নির্দিষ্ট লোকবল, লাঠিয়াল বাহিনী এবং নজরদারি টিম। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতির খবর পেলেই দ্রুত স্থান পরিবর্তন করা হয়। কখনো দোকানের আড়ালে, কখনো আবাসিক এলাকার ভেতরে, আবার কখনো নির্জন স্থানে বসানো হয় জুয়ার বোর্ড।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো—এই জুয়ার সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে শহীদ প্রশাসন ও কিছু অসাধু সাংবাদিককে নিয়মিত ‘ম্যানেজ’ করে থাকেন। স্থানীয়দের দাবি, নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অভিযানের আগাম তথ্য ফাঁস হয়ে যায়, ফলে বোর্ড সরিয়ে নেওয়া হয়। ফলে বছরের পর বছর ধরে চললেও কার্যত কোনো বড় ধরনের অভিযান চোখে পড়ছে না।
এদিকে, এই জুয়ার আসরের ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অসংখ্য মানুষ সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছে। কেউ জমি বিক্রি করছে, কেউ ঘরের আসবাবপত্র, আবার কেউ ধার-দেনায় ডুবে পরিবারসহ মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেক পরিবারে ভাঙন, দাম্পত্য কলহ ও সহিংসতার ঘটনাও বাড়ছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, জুয়ার আসরকে কেন্দ্র করে আশপাশে বেড়েছে চুরি, ছিনতাই, মাদক সেবন এবং বখাটেপনা। সন্ধ্যার পর সাধারণ মানুষের চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে। অভিভাবকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে চরম উদ্বেগ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী জানান, শুরুতে অল্প লাভ দেখিয়ে মানুষকে জুয়ার প্রতি আকৃষ্ট করা হয়। পরে বড় অঙ্কের টাকার খেলায় টেনে এনে সর্বস্বান্ত করা হয়। একবার ঋণের ফাঁদে পড়লে বের হওয়ার আর কোনো পথ থাকে না।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল। তাদের মতে, এত বড় পরিসরে দীর্ঘদিন ধরে জুয়ার কার্যক্রম চললেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অজানা থাকার কোনো সুযোগ নেই। ফলে জনমনে সন্দেহ জোরালো হচ্ছে—এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে কোনো প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশ রয়েছে কিনা।
মুঠোফোনে শহীদসহ অভিযুক্তদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তারা কেউই ফোন রিসিভ করেননি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এখনই যদি এই জুয়ার গডফাদার শহীদ ও তার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান না চালানো হয়, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। একটি শহরের সামাজিক স্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম—সবকিছুই হুমকির মুখে পড়বে।
বরিশালবাসীর এখন একটাই প্রশ্ন—জুয়া শহীদের দাপটে নগরী কি এভাবেই জিম্মি থাকবে, নাকি প্রশাসন অবশেষে কঠোর অবস্থান নেবে?
এ ব্যাপারে শহীদের সাথে মোবাইলে কথা বললে সে জানান, আগে আমি এর সাথে জড়িত ছিলাম কিন্তু এখন করি না। তবে আপনি নিউজ লিখতে চাইলে লিখতে পারেন।







