দীর্ঘ দমন-পীড়ন, মামলা-হামলা, আত্মগোপন আর কারাবরণের মধ্য দিয়ে রাজপথে টিকে থাকা বরিশাল জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের একঝাঁক ত্যাগী নেতা এখন নেতৃত্বের স্বীকৃতির প্রত্যাশায়। প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করা বর্তমান কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগকে ঘিরে সংগঠনের ভেতরে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনার পাশাপাশি নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা।
ছাত্রদলের এই নেতাদের অনেকেই জীবনের স্বাভাবিক গতিপথ থেকে সরে এসে রাজনীতিকেই বেছে নিয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, এমনকি বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও তারা পিছিয়ে দিয়েছেন সংগঠনের প্রয়োজনে—এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, প্রতিকূল রাজনৈতিক বাস্তবতায় টিকে থাকাটাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ, আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই তারা আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন।
২০১১ সালে গঠিত আহ্বায়ক কমিটি দীর্ঘ সাত বছর দায়িত্ব পালনের পর ২০১৮ সালের ১৯ আগস্ট কেন্দ্রীয় ছাত্রদল বরিশাল জেলা ও মহানগরের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করে। এরপর টানা আট বছর ধরে একই নেতৃত্ব দায়িত্ব পালন করছে। এ সময়ে একাধিকবার রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক চাপ এবং মামলা-হামলার কারণে সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়।
বর্তমানে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়ায় নেতৃত্বের দৌড়ে মাঠে নেমেছেন জেলা ও মহানগরের ১৪ জন আলোচিত নেতা। তাদের প্রত্যেকেই সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পাওয়ার আশায় সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
মহানগর ছাত্রদলের সহসভাপতি তরিকুল ইসলাম তরিক বলেন,
“২০১৮ সালে গঠিত হয়েছিল আগের কমিটি। ধারাবাহিকতা থাকলে গত ৮ বছরে আরও অন্তত দুবার কমিটি হতো। কিন্তু সেই ধারাবাহিকতা তো রক্ষা করা যায়নি। ফ্যাসিস্ট সরকারের দমন-পীড়ন আর হামলা-মামলার কারণে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছিল। পুরো সময়টা থাকতে হয়েছে লুকিয়ে-পালিয়ে কিংবা জেলে। ফলে সাংগঠনিক নিয়ম অনুসরণ করাও সম্ভব হয়নি। আজ মুক্ত পরিবেশে তাই দলের কাছে সম্মানের আবদার জানিয়েছি।”
জেলা ছাত্রদলের সভাপতি পদপ্রত্যাশী নাইমুল হাসান সোহেল বলেন,
“স্কুল জীবন থেকে যে সংগঠন করে আজ জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছি। সংগঠনের পেছনে জীবনের এখন পর্যন্ত পুরোটা সময় ব্যয় করেছি। যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময় কাটিয়েছি হয় রাজপথে, নয়তো জেলে। মামলা খেয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছি বনে-জঙ্গলে। দলের জন্য পড়ে না থাকলে হয়তো আমাদেরও আর সবারমতো ঘর-সংসার, চাকরি সবই হতো। কিন্তু আমরা অবিচল থেকেছি বিএনপির আদর্শে। আজ আপনারা অনেক কথাই বলতে পারেন, বলতে পারেন যে পদ-পদবির আশায় আমরা বিয়ে করিনি। কিন্তু একটু পেছন ফিরে দেখুন, ৫ আগস্টের আগে আমরা যে কঠিন সময় পার করেছি সেই সময়ে কোনো বাবা কি ভরসা করে তার মেয়েকে আমাদের হাতে দিতেন? তখন তো খুন আর গুম হওয়ার লিস্টে ছিলাম। এখন আশায় আছি দল আমাদের এই ত্যাগের মূল্যায়ন করবে।”
বরিশাল মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব জিয়াউদ্দিন সিকদার বলেন,
“বছরের পর বছর ধরে এই যে ত্যাগ, এটাই মাঠপর্যায়ের হাজার হাজার নেতাকর্মীর ইতিহাস। ঘর-সংসার, পরিজন সব ফেলে এরা লড়েছেন ফ্যাসিস্ট হটাতে। আজ তারা মূল্যায়ন পাওয়ার অপেক্ষায়। এসব ত্যাগী পরীক্ষিত ছাত্র নেতাদের দল সঠিক মূল্যায়ন করবে বলে আমার বিশ্বাস।”
কেন্দ্রীয় বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুল হক নান্নু বলেন,
“আমাদের চেয়ারম্যান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অজানা কিছু নেই। গত ১৭ বছর কে কি করেছেন সব খবরই আছে তার কাছে। সে বিবেচনায় তিনি সবাইকে যথাযথ মূল্যায়ন করবেন বলে বিশ্বাস করি।”
সংগঠনের ভেতরের সূত্রগুলো বলছে, মহানগর ছাত্রদলের সহসভাপতি মুশফিকুর রহমান অভি, সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির, সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক তাসনিম, হাতেম আলী কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আহাদ হোসেন আবির এবং বিএম কলেজ শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস তালুকদারও নেতৃত্বের দৌড়ে সক্রিয় রয়েছেন। একইভাবে জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি তারেক আল ইমরান, আসিফ আল মামুন, সাধারণ সম্পাদক তৌফিক আল ইমরান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সবুজ আকন, সদর উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি আব্দুল কাদের এবং সাধারণ সম্পাদক আল আমিন মৃধা নিজ নিজ অবস্থান থেকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আস্থা অর্জনে কাজ করে যাচ্ছেন।
তাদের অনেকেই উচ্চশিক্ষিত এবং দীর্ঘদিন ধরে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ২০০২ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে এসএসসি পাস করা এসব নেতার বর্তমান বয়স ৩০-এর কোঠা পেরিয়েছে অনেক আগেই। সাধারণ সামাজিক বাস্তবতায় যেখানে এই বয়সে স্থায়ী পেশা ও পারিবারিক জীবন গড়ে ওঠে, সেখানে তারা বেছে নিয়েছেন সংগ্রামের পথ। ফলে ব্যক্তিগত জীবনের অনেক সিদ্ধান্তই তাদের কাছে গৌণ হয়ে গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন পর নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ ছাত্রদলের ভেতরে নতুন করে গতি তৈরি করেছে। ত্যাগী নেতাদের মধ্যে নেতৃত্বের এই প্রতিযোগিতা সংগঠনের জন্য ইতিবাচক হতে পারে, যদি তা সুস্থ ধারায় পরিচালিত হয়।
এদিকে তৃণমূল নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, এবার এমন নেতৃত্ব আসবে যারা অতীতের ত্যাগ-সংগ্রামের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করবে। আর সেই নেতৃত্ব নির্ধারণে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে—এমনটাই আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন কমিটি ঘোষণার অপেক্ষায় এখন পুরো বরিশাল ছাত্রদল। ত্যাগ, সংগ্রাম আর প্রত্যাশার এই অধ্যায় শেষ পর্যন্ত কাদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেয়—সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে দলীয় নেতাকর্মীসহ রাজনৈতিক মহল।







