মামুনুর রশীদ নোমানী,বরিশাল : ঝালকাঠি
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী (পুর) মো. খাইরুল ইসলামকে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে তলবের পরও তিনি এখনো বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন, যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট
মহলে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষা অবকাঠামো
উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, সরকারি
অর্থ আত্মসাৎ, দরপত্র প্রক্রিয়ায় কারসাজি এবং নিম্নমানের নির্মাণকাজের অভিযোগের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে তাকে দুদকের
প্রধান কার্যালয়ে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার
জন্য নোটিশ পাঠানো হয়।
অভিযোগ রয়েছে, জেলার বিভিন্ন শিক্ষা
প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ ও সংস্কার কাজে
নির্ধারিত মান বজায় না রেখে কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কাজ সম্পন্ন না হলেও বিল
উত্তোলনের অভিযোগও উঠেছে। এছাড়া নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে,
যার ফলে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ব্যবস্থা
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয় একাধিক ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে
অঘোষিত কমিশন এবং প্রভাব বিস্তারের
সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এতে সৎ ঠিকাদাররা বঞ্চিত হচ্ছেন এবং
নিম্নমানের কাজের ঝুঁকি বাড়ছে।
এদিকে, জেলার কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের
শিক্ষক ও অভিভাবকরাও নির্মাণ কাজের মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, নতুন ভবনের কিছু অংশে ফাটল, প্লাস্টার খসে পড়া এবং নিম্নমানের উপকরণ
ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত সহকারী প্রকৌশলী মো. খাইরুল ইসলাম বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমি নিয়ম মেনেই সব কাজ করেছি। দুদকের তলবের বিষয়ে আমি অবগত আছি
এবং নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেব।”
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর-এর সংশ্লিষ্ট একটি
সূত্র জানায়, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থাও
নেওয়া হতে পারে।
দুদকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন,
তদন্তের স্বার্থে বিভিন্ন প্রকল্পের নথিপত্র সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। প্রয়োজনে মাঠ পর্যায়ে সরেজমিন পরিদর্শনও করা হবে।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে এই অনিয়মের
বিষয়টি উঠে আসে।প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে শিক্ষা
প্রকৌশল অধিদপ্তরের একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার পর ২০২১ সালের আগস্ট মাসে ৫৬ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্য থেকে প্রথম কয়েকজনের বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনের
মাধ্যমে চাকরি নিশ্চিত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এই অনিয়মের সঙ্গে সরকারি কর্ম
কমিশনের (পিএসসি) সাবেক গাড়িচালক
“সৈয়দ আবেদ আলী” নামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত ছিলেন। পিএসসিতে চাকরি নিজেই নিয়েছিলেন
জালিয়াতি (ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার) করেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায়
পিএসসির থেকে চাকরি হারান এবং কারাগারে ছিলেন, এখন জামিনে আছেন।
অনুসন্ধানে “আবেদ আলীর” হাতে নিয়োগ
পাওয়া একাধিক প্রার্থীর সরাসরি যোগাযোগ
ও অর্থ লেনদেনের প্রমাণ তুলে ধরা হয়। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্য থেকে কয়েকজন মোটা
অঙ্কের টাকা দিয়ে চাকরি পেয়েছেন। অনুসন্ধানে পাওয়া নথি ও ব্যাংক লেনদেনের
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২২ সালে সম্পন্ন হওয়া শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী
প্রকৌশলী (পুর) পদে সরকারি কর্ম কমিশনের
সরাসরি নন-ক্যাডার নিয়োগ পরীক্ষায়
মেধাতালিকার প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়সহ
অন্তত চারজন প্রার্থীর সঙ্গে আবেদ আলীর
আর্থিক লেনদেন হয়েছে। এই চার কর্মকর্তার মধ্যে অন্যতম হলেন,
ঝালকাঠি জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের
সহকারী প্রকৌশলী মো. খাইরুল ইসলাম।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মো. খাইরুল ইসলামকে নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে নিয়োগ ও অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের শুরুতে বিভিন্ন
গণমাধ্যম ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তাঁর নাম
জড়িয়ে বেশ কিছু তথ্য উঠে এসেছে।
প্রধান অনিয়ম ও অভিযোগসমূহ নিম্নরূপ:
নিয়োগে অস্বচ্ছতা: ২০২৬ সালের
জানুয়ারিতে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে
সহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায়। অভিযোগ রয়েছে যে, নির্ধারিত যোগ্যতা ও
মেধা তালিকার তোয়াক্কা না করে আর্থিক
লেনদেন বা রাজনৈতিক প্রভাবে অনেককে
নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ: মো. খাইরুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন প্রকৌশলীর
বিরুদ্ধে নিয়োগ ও পদায়নকে কেন্দ্র করে
অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।
বিভাগীয় ও দুদকের নজরদারি: শিক্ষা
প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কেনাকাটা ও নির্মাণ কাজে অনিয়মের
অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)
অনুসন্ধান চালাচ্ছে। অনেক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা ও চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে।
অযোগ্যদের নিয়োগের অভিযোগ: সাধারণ পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ ছিল যে, যারা
সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের অনেকেরই প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতা বা যথাযথ শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম নিয়ে
বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল-২৪ এর
অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান ‘সার্চলাইট’-এ বিস্তারিত
তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও বর্তমান অবস্থা:
মো. খাইরুল ইসলামের নামে এসব অভিযোগে জড়িয়েছে।
অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও এসব অনিয়মে পরোক্ষ সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে
বর্তমান অবস্থা
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নিয়োগ দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মো. খাইরুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান চলমান রয়েছে।
সম্পদ বিবরণী নোটিশ:
মো. খাইরুল ইসলামকে তাঁর সম্পদের উৎস
ব্যাখ্যা করতে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে
সম্পদ বিবরণী দাখিলের জন্য প্রাথমিক
নোটিশ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
অভিযোগের ধরণ:
তাঁর বিরুদ্ধে মূলত ২০২১ সালের নিয়োগ
পরীক্ষায় জালিয়াতি এবং পরবর্তী সময়ে অবৈধ আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সম্পদ গড়ার
অভিযোগ অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে
যুক্ত স্থানীয় নাগরিকরা বলছেন, শিক্ষা খাতের
উন্নয়ন প্রকল্পে এ ধরনের অনিয়ম দেশের
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হুমকি। তারা দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে
দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি
জানিয়েছেন।
তবে এখনো পর্যন্ত প্রশাসনিকভাবে তার
বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা
না নেওয়ায় জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—দুদকের তলবের পরও কীভাবে তিনি বহাল
তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন? তদন্তের
অগ্রগতি ও পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে এখন
সবার নজর।
জনমনে প্রশ্ন
স্থানীয় সুশাসনকর্মীরা বলছেন, শিক্ষা খাতে
এমন অনিয়ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের প্রশ্ন—দুদকের তলবের পরও কীভাবে অভিযুক্ত
কর্মকর্তা দায়িত্বে বহাল থাকেন?







