মামুনুর রশিদ নোমানী //
বরিশাল সিটি করপোরেশনের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতির চক্র এবার প্রকাশ্যে চলে এসেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে টেন্ডার কারসাজি, জালিয়াতি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অন্তত ১০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে। তদন্তের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একে একে বেরিয়ে আসছে প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের নাম, যা নগরজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
দুদকের অনুসন্ধানে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তি পাওয়া গেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন তৎকালীন সচিব মাসুমা আক্তার, প্রধান প্রকৌশলী হুমায়ুন কবির, সাবেক হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মশিউর রহমান, জনসংযোগ কর্মকর্তা আহসান উদ্দিন রোমেল, সম্পত্তি কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান শাকিল, উপসহকারী প্রকৌশলী এইচ এম কামাল, সাইফুল ইসলাম মুরাদ, সার্ভেয়ার সাইদুর রহমান, প্ল্যান শাখার সহকারী খায়রুল হাসান এবং কম্পিউটার অপারেটর ফিরোজ হোসেন।
এই তালিকা সামনে আসতেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, বিসিসির ভেতরে একটি সুসংগঠিত চক্র দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়মে জড়িত ছিল। উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র থেকে শুরু করে সম্পত্তি বরাদ্দ, ক্রয় প্রক্রিয়া থেকে নিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই এই চক্রের প্রভাব ছিল বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালানো হলেও অন্তত ১০ জনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। এছাড়া কয়েকজনের ক্ষেত্রে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, টেন্ডার প্রক্রিয়াকে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রভাবিত করে নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের নামে নাটক সাজিয়ে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প বণ্টন করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি সম্পত্তি বরাদ্দে স্বজনপ্রীতি ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রেও ভয়াবহ অনিয়ম ধরা পড়েছে। ল্যাপটপ, ড্রোন, আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন পণ্য কেনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ করে সরকারি অর্থ লুটপাটের বিষয়টিও তদন্তে উঠে এসেছে।
চাকরিচ্যুত ব্যক্তিদের পুনঃনিয়োগ এবং উৎসবভিত্তিক ব্যয়ে অস্বচ্ছতার মতো ঘটনাও এই দুর্নীতির চিত্রকে আরও স্পষ্ট করেছে। সব মিলিয়ে বিসিসির প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে গভীরভাবে প্রোথিত অনিয়মের চিত্র ফুটে উঠেছে।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে অভিযুক্তদের দুদক কার্যালয়ে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং তাদের সম্পদের হিসাব জমা দিতে বলা হয়। কিন্তু তাদের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার অসামঞ্জস্য ধরা পড়ায় তদন্ত আরও জোরালো হয়।
এই তলবের পর থেকেই বিসিসির ভেতরে অস্থিরতা বাড়তে থাকে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, প্রশাসনিক কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দেয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
বর্তমানে অনুসন্ধান রিপোর্ট অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন মিললেই মামলা দায়ের, চার্জশিট প্রস্তুত এবং বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে। চার্জশিট আদালতে গৃহীত হলে সংশ্লিষ্টদের সাময়িক বরখাস্ত এবং পরবর্তীতে স্থায়ী অপসারণের পথও খুলে যাবে।
এই ঘটনায় বরিশাল সিটি করপোরেশন এখন এক কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে। দুর্নীতির এই জাল ভেঙে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে কিনা, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।







