TT Ads

 

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) বরিশাল কার্যালয় ঘিরে গড়ে ওঠা দালালচক্রের নিয়ন্ত্রক সেখানকার মোটরযান পরিদর্শক সৌরভ কুমার সাহা। দফায় দফায় অবৈধ গাড়ির নিবন্ধন করায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছে। মামলায় জামিন নিয়ে আবারও অবৈধ বাণিজ্যে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন সৌরভ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯১টি অটোরিকশার অবৈধ নিবন্ধন দেওয়ায় ২০২৫ সালের ২৪ জানুয়ারি সৌরভসহ সংশ্লিষ্ট অন্যদের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।এ মামলায় গ্রেপ্তার হলেও পরে জামিনে মুক্ত হন সৌরভ।  এ ছাড়া আমদানি ছাড়াই তাঁর মাধ্যমে ২০৬টি থ্রি-হুইলার জাল কাগজে নিবন্ধন দেওয়ার বিষয়টিও দুদকের প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১১ বছরে সৌরভ বাবা, শ্বশুর, শ্যালকসহ অন্য আত্মীয়দের নামে অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন। কিনেছেন ১০টি বাস, চারটি প্রাইভেট কার, কিছু সিএনজিচালিত অটোরিকশা।
ফরিদপুরে নিজ এলাকায় সৌরভের ভগ্নিপতি অটোরিকশা বাণিজ্য দেখভাল করেন। সৌরভ নিজের জন্য কিনেছেন অর্ধকোটি টাকার পাজেরো গাড়ি। বিআরটিএর  উত্তরা, গোপালগঞ্জ, চাঁদপুর, মাদারীপুরসহ বিভিন্ন কার্যালয়ে চাকরি করেছেন তিনি। মাসে অবৈধভাবে কামান ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা।
জানা গেছে, দুদকের অভিযানে বিআরটিএ বরিশাল কার্যালয় থেকে ২০২৫ সালের ৭ মে গ্রেপ্তার করা হয় দালাল সঞ্জীব কুমার দাসকে। অবৈধ গাড়ির নিবন্ধন অনুমোদনের কাগজপত্রসহ তাঁকে আটকের পর এক মাসের কারাদণ্ডও দেওয়া হয়। দুদক সঞ্জীবের দালালি রোধ করতে পারেনি। কারণ তাঁর পেছনে আছেন এই সৌরভ সাহা। শুধু সঞ্জীবই নন, সৌরভের হয়ে বরিশাল বিআরটিএতে দালালি করেন আলাউদ্দীন, জাকির, আসাদুল ও হৃদয়।তাঁদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এ কার্যালয়। ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস ও নিবন্ধনসহ অন্যান্য সেবাকে কেন্দ্র করে বাণিজ্য এই দালালদের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রণ করেন সৌরভ। দুদকের  বরিশাল কার্যালয়ের উপপরিচালক রাজকুমার সাহা বলেন, ‘সৌরভ সাহার বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ২৪ জানুয়ারি করা মামলাটির প্রতিবেদন দাখিল করার বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। অপরাধে তিনি জড়িত—এটা প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে, চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তা প্রকাশ করা হবে। সৌরভ সাহা জামিনে রয়েছেন। দুর্নীতির অভিযোগে মামলার পরও কর্তৃপক্ষ তাঁকে সেখান থেকে প্রত্যাহার করেনি কেন, এটা তাদের ব্যাপার। তবে আমরা তাঁকে নজরদারিতে রেখেছি।’
জানা গেছে, গত ২৬ জানুয়ারি দুর্নীতির মামলায় বরিশাল বিআরটিএর সাবেক সহকারী পরিচালক এমডি শাহ আলমকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। এমডি শাহ আলম বিআরটিএর বরিশাল, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর জেলার সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বরিশাল কার্যালয়ে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ৩৪৪টিসহ প্রায় আড়াই হাজার গাড়ির ভুয়া নিবন্ধন দেওয়ার মামলায় তিনি অভিযুক্ত হন। গত বছর তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। চাকরির শেষ আট বছরে শাহ আলমের বিরুদ্ধে বরিশাল, ঝালকাঠি, পিরোজপুর ও চট্টগ্রাম বিআরটিএতে প্রায় ৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে দুদক। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বরিশাল বিআরটিএ থেকে অবসরে যান শাহ আলম। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে বরিশাল বিআরটিএতে মোটরযান পরিদর্শক হিসেবে যোগ দেন সৌরভ।
জানা গেছে, সৌরভ তাঁর নিজ এলাকা ফরিদপুরে শ্রীময়ী পরিবহন কম্পানির কয়েকটি বাস কিনেছেন। এগুলো তিনি কেনেন তাঁর বাবার নামে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তাঁর বাবা একজন হকার ছিলেন। লাখ লাখ টাকা দিয়ে গাড়িগুলো কেনা তাঁর বাবার পক্ষে কোনোক্রমেই সম্ভব ছিল না। এর বাইরেও হাওলাদার পরিবহন নামের ঢাকা-বরিশাল রুটের একটি গাড়িতে বেশির ভাগ শেয়ার রয়েছে সৌরভের। ২০১৪ সালে বিআরটিএ নোয়াখালী অফিসে মেকানিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে চাকরি শুরু করেছিলেন সৌরভ। পদোন্নতি পেয়ে ২০২৩ সালে বরিশালে মোটরযান পরিদর্শক হিসেবে যোগদান করেন।
জানা গেছে, ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষায় অকৃতকার্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন বিআরটিএর চিহ্নিত দালাল আলাউদ্দীন, জাকির, আসাদুল ও হৃদয়। এরপর শুরু হয় বাণিজ্য। আদায়কৃত ঘুষের ৮০ শতাংশই নেন সৌরভ। বাকি ২০ শতাংশ বণ্টন করা হয় দালালদের মধ্যে।
দুর্নীতির অভিযোগ এনে দুদক তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছে স্বীকার করে সৌরভ সাহা গত শনিবার বলেন, ‘ওই মামলায় বর্তমানে জামিনে আছি। দালালদের চিনলেও তাঁদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই।’ তাঁর বাবার নামে ফরিদপুরে বাস রয়েছে বলে স্বীকার করেন সৌরভ। তবে হাওলাদার পরিবহনের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে জানান।

TT Ads