TT Ads

 

স্টাফ রিপোর্টার:

অভাব-অনটনের সংসার থেকে উঠে আসা এক তরুণ—যার শৈশব কেটেছে টানাপোড়েনে, কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় জীবনের লক্ষ্য। স্থানীয়দের ভাষ্য, ছোটবেলা থেকেই টাকার প্রতি অস্বাভাবিক আকর্ষণ ছিল তার। আর সেই আকর্ষণই যেন ধীরে ধীরে তাকে ঠেলে দিয়েছে এক অন্ধকার জগতে। সেই তরুণই এখন বরিশাল বিআরটিএ কার্যালয় ঘিরে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী দালালচক্রের নিয়ন্ত্রক—মোটরযান পরিদর্শক সৌরভ কুমার সাহা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া সৌরভের বাবা ছিলেন একজন হকার। সংসারে স্বচ্ছলতা ছিল না, বরং প্রতিদিনের লড়াই ছিল টিকে থাকার। কিন্তু এই বাস্তবতা তাকে সংগ্রামী না করে বরং অন্য পথে হাঁটার মানসিকতা তৈরি করে দেয়—এমনটাই দাবি এলাকাবাসীর। ছোটবেলা থেকেই ছিল তার চালাক-চতুর আচরণ, অর্থ উপার্জনের অদ্ভুত কৌশল রপ্ত করার প্রবণতা। এলাকাবাসীর অনেকেই বলেন, তার বুদ্ধির কাছে ছোটবেলায়ই নাজেহাল হতে হয়েছে অনেককে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেই কিশোর বয়স থেকেই ‘কিভাবে সহজে টাকা আয় করা যায়’—এই চিন্তাই তাকে তাড়িত করত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রবণতা আরও গভীর হয়েছে। আর সরকারি চাকরিতে প্রবেশের পর যেন সেই সুযোগকে পুঁজি করে গড়ে তুলেছেন এক বিশাল অবৈধ বাণিজ্য নেটওয়ার্ক।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) বরিশাল কার্যালয় ঘিরে বর্তমানে যে দালালচক্র সক্রিয়, তার মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে উঠে এসেছে সৌরভ সাহার নাম। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি দফায় দফায় অবৈধ গাড়ির নিবন্ধন দিয়েছেন।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৪ জানুয়ারি ১৯১টি অটোরিকশার অবৈধ নিবন্ধনের ঘটনায় সৌরভসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। গ্রেপ্তার হলেও পরে জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। শুধু তাই নয়, আমদানি ছাড়াই ২০৬টি থ্রি-হুইলার জাল কাগজে নিবন্ধন দেওয়ার প্রমাণও প্রাথমিক তদন্তে পেয়েছে দুদক।

স্থানীয়দের দাবি, গত ১১ বছরে সৌরভ তার বাবা, শ্বশুর ও অন্যান্য আত্মীয়দের নামে অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন। কিনেছেন ১০টি বাস, চারটি প্রাইভেট কার এবং একাধিক সিএনজিচালিত অটোরিকশা। নিজে ব্যবহার করছেন প্রায় অর্ধকোটি টাকার পাজেরো গাড়ি। অথচ একজন হকারের পক্ষে এমন সম্পদ অর্জন বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক—এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ফরিদপুরে তার ভগ্নিপতি অটোরিকশা বাণিজ্য দেখভাল করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন পরিবহন ব্যবসায় রয়েছে তার গোপন বিনিয়োগ। মাসে অবৈধভাবে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা আয় করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

বিআরটিএ বরিশাল কার্যালয়ে দালাল সিন্ডিকেট পরিচালনায় তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের নামও উঠে এসেছে—সঞ্জীব কুমার দাস, আলাউদ্দীন, জাকির, আসাদুল ও হৃদয়। এদের মাধ্যমে ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস ও নিবন্ধন কার্যক্রমে চলে ব্যাপক অনিয়ম। অভিযোগ রয়েছে, আদায়কৃত ঘুষের ৮০ শতাংশই যায় সৌরভের পকেটে, বাকি ২০ শতাংশ ভাগ হয় দালালদের মধ্যে।

দুদকের অভিযানে ২০২৫ সালের ৭ মে দালাল সঞ্জীব কুমার দাসকে গ্রেপ্তার করা হলেও দালালচক্র বন্ধ হয়নি। বরং অভিযোগ রয়েছে, সৌরভের ছত্রচ্ছায়ায় আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এ চক্র।

দুদকের বরিশাল কার্যালয়ের উপপরিচালক রাজকুমার সাহা জানিয়েছেন, মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে। প্রাথমিকভাবে সৌরভ সাহার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হবে। তবে মামলার পরও তাকে দায়িত্বে বহাল রাখা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এদিকে, বিআরটিএর সাবেক সহকারী পরিচালক এমডি শাহ আলমের বিরুদ্ধেও একই ধরনের দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে দুদক। তার অবসরের পরপরই বরিশাল কার্যালয়ে যোগ দেন সৌরভ, আর এরপর থেকেই নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠে এই চক্র—এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

সব অভিযোগ অস্বীকার করে সৌরভ সাহা দাবি করেছেন, দালালদের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে বাবার নামে বাস থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন তিনি।

অভাবের সংসার থেকে উঠে আসা এক তরুণ—যার শৈশব ছিল সংগ্রামের, সেই গল্প এখন ঢেকে গেছে কোটি টাকার অবৈধ সাম্রাজ্যের ভারে। প্রশ্ন উঠেছে, এই উত্থান কি শুধুই পরিশ্রমের, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে সুপরিকল্পিত দুর্নীতির দীর্ঘ ছায়া?

 

TT Ads