TT Ads

 

স্টাফ রিপোর্টার:
নগরবাসীর জন্য নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা দিতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বরিশালের রূপাতলীর ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট এখন চরম অনিয়ম, দখলদারিত্ব ও ক্ষমতার অপব্যবহারের এক নগ্ন উদাহরণে পরিণত হয়েছে। জনস্বার্থে নির্মিত এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটি ব্যবহার হচ্ছে ব্যক্তিগত পশুর খামার হিসেবে—এমন বিস্ফোরক অভিযোগ সরাসরি গিয়ে পড়েছে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার ওপর।

সরেজমিনে ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্লান্টের নির্ধারিত জমির একটি বড় অংশ দখল করে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে দুম্বা, ছাগল ও ভেড়ার খামার। শুধু পশু পালনেই থেমে নেই, বরং খামারটিকে টেকসই করতে প্লান্টের ভেতরেই ঘাস চাষ করে পশুখাদ্যের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। অর্থাৎ জনকল্যাণের প্রকল্পকে পরিকল্পিতভাবে ব্যক্তিগত সম্পদে রূপান্তরের অভিযোগ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো—এই খামার পরিচালনায় ব্যবহার করা হচ্ছে সিটি কর্পোরেশনের বেতনভুক্ত কর্মচারীদের। অন্তত চারজন কর্মচারী নিয়মিতভাবে পশু পরিচর্যা, খাবার দেওয়া ও খামার দেখভালের কাজে নিয়োজিত রয়েছেন বলে জানা গেছে। এতে একদিকে যেমন সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরেই গড়ে উঠছে এক ধরনের ‘অবৈধ সংস্কৃতি’, যেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিজেদের ক্ষমতা ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় সম্পদকে ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত করছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের মতো অতিসংবেদনশীল স্থাপনার ভেতরে পশু পালন শুধু অনৈতিক নয়, বরং এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। পশুর বর্জ্য থেকে নির্গত ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, অ্যামোনিয়া ও অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। এগুলো দীর্ঘমেয়াদে শ্বাসতন্ত্রের রোগ, চর্মরোগ ও সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

এছাড়া সবচেয়ে বড় আশঙ্কা—বৃষ্টির পানির সঙ্গে পশুর মলমূত্র মিশে প্লান্টের পানি উৎস দূষিত হওয়ার সম্ভাবনা। যদি এই দূষণ পানির পরিশোধন ব্যবস্থায় প্রবেশ করে, তাহলে পুরো নগরবাসীই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। অর্থাৎ একটি অব্যবস্থাপনা থেকে তৈরি হতে পারে জনস্বাস্থ্যের বড় ধরনের বিপর্যয়।

এদিকে প্লান্ট সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা চরম ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, খামার থেকে ছড়ানো তীব্র দুর্গন্ধে স্বাভাবিক জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। দিনের পর দিন বর্জ্য অপসারণ না করায় পরিবেশ পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠছে।

আইন ও প্রশাসনিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি প্রকল্পের জমি দখল করে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা সরাসরি দণ্ডনীয় অপরাধ। একই সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা দুর্নীতি দমন কমিশনের আওতায় তদন্তযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। পরিবেশ দূষণের বিষয়টি প্রমাণিত হলে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে কঠোর শাস্তির বিধানও রয়েছে।

বিসিসির স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. রবিউল ইসলাম বিষয়টি থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন দাবি করে বলেন, এই খামারের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং পশুগুলো প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার বলে উল্লেখ করেন।

তবে সবচেয়ে বিতর্কিত প্রতিক্রিয়া এসেছে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল বারীর কাছ থেকেই। অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি উল্টো সাংবাদিকদের প্রশ্ন করে বসেন, “এসব বিষয় নিয়ে আপনাদের মাথাব্যথা কেন? যা পারেন করেন।” তার এই বক্তব্য শুধু দায়িত্বহীনতারই পরিচয় দেয়নি, বরং পুরো ঘটনাকে আরও সন্দেহজনক করে তুলেছে।

বরিশাল জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক কাজী সাইফুদ্দিন জানিয়েছেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন জানিয়েছেন, বিষয়টি তার জানা ছিল না, তবে দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, একটি জনকল্যাণমূলক প্রকল্পকে ব্যক্তিগত খামারে রূপান্তরের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়—এটি প্রশাসনিক জবাবদিহিতার চরম ব্যর্থতার প্রতিফলন। তারা অবিলম্বে প্রকল্প এলাকা দখলমুক্ত করা, জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং পুরো বিষয়টি উচ্চপর্যায়ের তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

নগরবাসীর প্রশ্ন এখন আরও তীব্র—যে স্থাপনা তাদের বিশুদ্ধ পানি দেওয়ার কথা, সেটিই যদি পরিণত হয় দূষণ ও অনিয়মের উৎসে, তাহলে তাদের নিরাপত্তা কোথায়? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপই এখন নির্ধারণ করবে, এই অনিয়মের শেষ কোথায় গিয়ে থামবে।

 

TT Ads